বগুড়ায় অবিশ্বাস্য এক ঘটনা নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। ছয় বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ করেছে তার ৮০ বছর বয়সী আপন দাদা। মেডিক্যাল পরীক্ষার পর শিশুটির চিকিৎসক মা বাদি হয়ে দায়ের করেছেন মামলা। পুলিশ অভিযুক্ত সেই দাদাকে গ্রেফতারও করেছিল। কিন্তু গ্রেফতারের দুই ঘন্টার মধ্যেই ৫০ লাখ টাকার বিনিময়ে সেই অভিযুক্তকে জামিন দিয়েছে বগুড়ার দুপচাঁচিয়া আমলী আদালত। ঘটনাটি এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।
মামলার এজাহার ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বগুড়ার মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের একজন চিকিৎসক তার স্বামী ও জমজ দুই কন্যা সন্তানকে নিয়ে বসবাস করেন। গত ২৮ নভেম্বর সকালে শিশুটির চিকিৎসক মা ঢাকায় দুই সন্তানকে স্বামী ও ননদের কাছে রেখে চিকিৎসা সংক্রান্ত কাজে ঢাকায় যান। রাতে বাড়ি ফিরে একজন কন্যা সন্তানের পরিহিত প্যান্টে রক্ত দেখে বিচলিত হয়ে পড়েন। পরে তাৎক্ষনিক একজন সহকর্মী চিকিৎসককে বিষয়টি জানালে তিনি প্রাথমিকভাবে পরীক্ষার পর বুঝতে পারেন শিশুটিকে ধর্ষণ করা হয়েছে। পরদিন বগুড়ার শহীদ জিয়ার রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টারে ভর্তি করা হয়। ওসিসির চিকিৎসকরা জানান, ধর্ষণ চেষ্টার কারণে শিশুটির যোনিপথ ছিঁড়ে গিয়েছে। সেখানে তিন দিন চিকিৎসার পর ২ ডিসেম্বর হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে বগুড়ার দুপচাঁচিয়া থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।
যেভাবে জানা গেল দাদার নাম
পুলিশ ও ভূক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২৮ নভেম্বর ওই নারী চিকিৎসক ঢাকায় যাওয়ার পর তার বাবা ডা. সৈয়দ ছানাউল ইসলাম তার দুই মেয়েকে নিয়ে দাদার বাড়ি দুপচাঁচিয়া কাথহালি মিয়াবাড়িতে যান। সেখানেই শিশুটি দাদার কাছে ধর্ষণের শিকার হন।
ভিক্টিম পরিবারের সদস্যরা জানান, শিশুটিকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়ার পর তাকে দুপচাঁচিয়া থানায় নেওয়া হয়। সেখানে একজন নারী পুলিশ শিশুটিকে খেলার ছলে কী হয়েছিল জিজ্ঞাসা করেন। জিজ্ঞাসার এক পর্যায়ে শিশুটি জানায় তার দাদা তার গোপন জায়গায় ব্যাথা দিয়েছে। এজন্য সেখান থেকে রক্তপাত হয়েছে।
মামলার পর দাদা গ্রেফতার, ৫০ লাখ টাকায় জামিনে মুক্ত
সংশ্লিষ্টরা জানান, শিশুটি নিজেই দাদার কাছে ধর্ষণের শিকারের কথা বললে, ৩ ডিসেম্বর আশি বছর বয়সী দাদা সৈয়দ আব্দুল জলিকে আসামী করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করা হয়। ঘটনাটি স্পর্শকাতর হওয়ায় দুপুরেই দুপচাঁচিয়া থানা পুলিশ আসামী সৈয়দ আব্দুল জলিলকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের পর তাকে বগুড়ার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের দুপচাঁচিয়া আমলী আদালতে সোপর্দ করে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে শিশু ধর্ষণের মতো স্পর্শকাতর মামলায় আদালত প্রথম শুনানীতেই জামিন মঞ্জুর করে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আসামী আব্দুল জলিলের একজন নিকটাত্মীয় স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর একজন শীর্ষ নেতা। এছাড়া পরিচারটিও জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। একারণে মামলা দায়েরের পরপরই তারা প্রভাব খাটিয়ে ও ৫০ লাখ টাকার বিনিময়ে তাৎক্ষণিক জামিনের ব্যবস্থা করেন।
শিশু ধর্ষণের মামলায় তাৎক্ষণিক জামিনের বিষয়টি জানাজানি হলে আদালত পাড়াতেও কৌতুহল সৃষ্টি হয়। বগুড়ার জুডিশিয়াল সার্ভিসে কর্মরত একজন ব্যক্তি জানান, তিনি তার চাকরী জীবনে শিশু ধর্ষণের মামলায় তাৎক্ষণিক জামিনের ঘটনা কখনো দেখেননি। এখানে বিপুল অঙ্কের অর্থের লেনদেন হয়েছে বলেও তিনি শুনেছেন।
বাবার বিরুদ্ধে রক্তমাখা প্যান্ট গায়েবের অভিযোগ
জানা গেছে, ধর্ষণের ঘটনার দিনগত রাতে শিশুটির রক্তমাখা প্যান্ট বাসার একটি কক্ষে রাখা হয়েছিল। কিন্তু পরদিন সকালে সেই প্যান্ট আর পাওয়া যায়নি। স্বজনদের ধারণা, শিশুটিকে ধর্ষণের বিষয়টি বাবা সৈয়দ ছানাউল ইসলাম ও ফুফু জাকিয়া সুলতানা রোজী জানতেন। কিন্তু একদিকে সন্তান ও আরেকদিকে বৃদ্ধ বাবা হওয়ার কারণে তারা বাবার পক্ষ নিয়ে ঘটনাটি প্রথমে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। একারণে রাতে শিশুটির মা বাসায় ফিরলেও প্রথমে তাকে কিছু জানানো হয়নি। সুযোগ বুঝে বাবা সৈয়দ ছানাউল ইসলাম আলমত হিসেবে রাখা রক্তমাখা প্যান্টটি সরিয়ে ফেলেন।
স্বজনরা জানান, নিজের সন্তান এরকম নির্মম নির্যাতনের শিকার হলেও সৈয়দ ছানাউল ইসলামের ভূমিকা ছিল নির্বিকার। পাগলপ্রায় মা সন্তান নিয়ে হাসপাাতালে দৌড়াদৌড়ি করলেও বাবা অফিস শেষে মেয়ের কাছে না গিয়ে টেনিস খেলার জন্য গিয়েছেন। এছাড়া স্ত্রীকে বারবার মামলা করা থেকে বিরত থাকতেও চাপ দিয়েছেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, মামলা দায়েরের পর শিশুটির বাবা সৈয়দ ছানাউল ইসলাম তার স্ত্রীকে ভয়ভীতি দেখানো শুরু করেছেন। সংসার ভেঙ্গে যাওয়ার ভয় দেখিয়ে বিষয়টি চেপে যাওয়ার প্রস্তাবও দেন। একই সঙ্গে স্থানীয় একাধিক সাংবাদিককে পাঠিয়ে বিষয়টি মিমাংসা করার জন্য প্রস্তাব দিয়েছেন।
পুলিশের ভূমিকাও রহস্যজনক
আলোচিত এই ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে প্রথমে তড়িৎ পদক্ষেপ নিলেও পরবর্তীতে আসামীদের পক্ষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, আসামীরা ইতোমধ্যে পুলিশকে ম্যানেজ করার জন্য বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। শিশুটির মায়ের শঙ্কা, আসামীরা প্রভাব খাটিয়ে ফরেনসিক প্রতিবেদন পরিবর্তন করার চেষ্টাও করতে পারে।
বিষয়টি জানতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুপচাঁচিয়া থানার সাব-ইন্সপেক্টর মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে পরিচয় পেয়ে মোবাইল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরবর্তীতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
- দাদা সৈয়দ আব্দুল জলিল
- দাদার হাতে নাতনি ধর্ষণ
- বগুড়া
- বগুড়া পুলিশ
- বগুড়ায় শিশু ধর্ষণ
- সৈয়দ ছানাউল ইসলাম
- সূত্র : ঢাকা ট্রিবিউন







